দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের ভূমিকা অপরিসীম। সরকারি স্বাস্থ্য খাতে টেকসই উন্নয়ন ও সেবার মানোন্নয়নে (হেলথ সিস্টেম ট্রেন্ডিং ক্যাটাগরিতে) মনোনীত হওয়া তথা বিশেষ অবদান রাখায় শ্রেষ্ঠত্বের খেতাবে ভূষিত হয় বগুড়ার শেরপুরের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী।
তাইতো উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কার্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী করা এবং সরকারের নতুন নির্দেশনাগুলো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যেই সেরা কয়েকজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) সম্মেলনে এ সম্মাননা গ্রহন করেন ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী।
হেলথ সিস্টেম ট্রেন্ডিং-এ ২০২৫ সালে ডা. শেরপুরের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে সকল গুরুত্বপূর্ণ সুযোগে অন্তঃবিভাগ, অস্ত্রপচার সুবিধা, ল্যাবরেটরী সেবা ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় ধারাবাহিকভাবে ৫মাস প্রথম স্থান অক্ষুন্ন রেখেছে। এর স্বীকৃতি স্বরুপ তাকে হেলথ সিস্টেম ট্রেন্ডিং ক্যাগারিতে মনোনীত করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জন্য চিকিৎসার পরিবেশ উন্নতকরণ, মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবার হার বৃদ্ধি করা, নরমাল ডেলিভারির হার বৃদ্ধি এবং প্রসূতি ও নবজাতক মৃত্যুহার কমিয়ে আনা, সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) শতভাগ সফলতা অর্জন। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ও ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম স্বাস্থ্যসেবায় ও তথ্য আদান-প্রদান সহজতর করা। এছাড়াও হাসপাতালের আঙিনা ও হাসপাতালের ভেতরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের সেবার ক্ষেত্রে রোগীদের সাথে আন্তরিকতা। করোনা বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা এবং আন্ত বিভাগীয় চিকিৎসায় অনন্য অবদানের কমতি নেই এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার।
২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে পাশ করা ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী। তবে তার পুরো নাম সাধারণ মানুষের মুখে না আসলেও ডাক নাম ‘লিংকন’ বলে পরিচিত সর্বত্রই। ২০২১ সালের ১২ আগস্ট শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন তিনি। এ হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও প্রাকৃতির সৌন্দর্য্যরে দৃশ্যপট পাল্টাতে মনোনিবেশ করতেও কার্পূণ্যতা রাখেনি। যার বহিঃপ্রকাশ উপজেলা পর্যায়ে বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা ও মনমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ।
ডাক্তার সাজিদ হাসান সিদ্দিকী লিংকনের তত্বাবধায়নে হাসপাতালটি ২০২৪ সালে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতসহ নয়নাভিরাম দৃশ্যে দেশসেরার তালিকায় শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সারাদেশের ৪৯২টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৯.৪৪ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে স্বাস্থ্য বিভাগের র্যাংকিং-এ সারাদেশের ৪৯২টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৬.৮৮ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২২ এপ্রিল এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩ কোটি ৮৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক চারতলা বিশিষ্ট ওপিডি ভবন (ট্রমা সেন্টার)সহ আরও ৪টি ভবন নির্মাণ হয়। এমন অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও হাসপাতালটিতে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা ছিল খুবই কম। পরে ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী লিংকনের হাত ধরে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রমের উদ্যোগ ও ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। তার নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে মানুষের আস্থা ফিরছে স্বাভাবিক প্রসবে। ইতিমধ্যে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসবে উপজেলায় সাড়া ফেলে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি।
এ ছাড়া দীর্ঘ ৩৬ বছর পর চালু করা হয়েছে অপারেশন থিয়েটার। নিয়মিত হচ্ছে সিজারিয়ান অপারেশন। পাশাপাশি এই হাসপাতালে প্রতি মাসে গড়ে অর্ধশতাধিক নরমাল ডেলিভারি হয়ে থাকে। নবজাতকের জন্য উপহারের ব্যবস্থাও চালু রয়েছে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। প্রায় ২২ বছর পর এই হাসপাতালে অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন চালু করা হয়েছে। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, যক্ষা রোগীদের জিন এক্সপার্ট পরীক্ষা, এএনসি এবং পিএনসি সেবা, সুসজ্জিত ডেন্টাল সার্ভিস, কৈশোর বান্ধবস্বাস্থ্য সেবা, টেলিমেডিসিন চিকিৎসা সেবা, হারবাল চিকিৎসা সেবা, ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেশার রোগীদের জন্য এনসিডি কর্নার, শিশুদের জন্য আইএমসিআই কর্ণর ও কেএমসি কর্ণারসহ রোগীদের জন্য অন্যান্য সকল ধরনের স্বাস্থ্যসেবা চালু রয়েছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের খাবারের জন্য আছে ডাইনিং রুমের ব্যবস্থা। যানবাহনের জন্য রয়েছে নিরাপদ গ্যারেজ।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ছাদে এখনো শোভা পাচ্ছে সারি সারি টবে সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে ঝুলছে ফল। পুরো হাসপাতাল চত্বরে গড়ে উঠেছে মিনি ফুলবাগান। এমন নৈসর্গিকভাবে সাজানো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীরা সেবা নিতে এসে বেশ খুশি। নিরিবিলি পরিবেশ আর মনোরম দৃশ্য মন কাড়ছে উপজেলাবাসীর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে বিশেষ সম্মানা গ্রহন করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প কর্মকর্তা ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী বলেন, এই সম্মাননা কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি পুরো স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মস্পৃহা ও দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তাছাড়া সম্মাননা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেই উৎসাহিত করবে না, বরং এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করবে।
তবে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং আন্তরিক সেবার সমন্বয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো যদি পরিচালিত হয়, তবেই সরকারের ‘সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দ্রুততর হবে দাবী করেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।