একদিন পর কোরবানি ঈদ। ঈদ উপলক্ষে শেষ মুহূর্তে সবাই ছুটছেন কামারপাড়ায়। কিনছেন দা-ছুরি-বটিসহ আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র। কামারদেরও ফুরসত নেই দম ফেলার। তবে কয়লা-লোহার দাম বৃদ্ধিতে দিশেহারা তারা। ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি প্রণোদনার দাবি কামার শিল্পে জড়িতদের।
কাঁচামাল লোহা ও কয়লার মূল্য বেড়ে যাওয়ায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও লাভের দেখা পাচ্ছেন না কামার শিল্পেরা। তাই ঈদেও মুখে হাসি নেই কামার শিল্পীদের।
শেষ মুহূর্তে জয়পুরহাট কামার পল্লীগুলোতে দা-ছুরিসহ কোরবানির নানা উপকরণ তৈরির ব্যস্ত। চেষ্টা, যতোটা বেশি সম্ভব বিক্রি করে পরিবার নিয়ে ঈদ আনন্দ করা।
গত বছর এক কেজি লোহার দাম ছিল ৮০ টাকা। বর্তমানে বাজার থেকে তা কিনতে হচ্ছে ১১৫-১২০ টাকায়। এক বস্তা (৮০ কেজি) কয়লার দাম ছিল সর্বোচ্চ এক হাজার ৩০০ টাকা। বর্তমান বাজারে তার দাম আড়াই হাজার টাকা।
কর্মকারদের ব্যবসার প্রধান উপকরণই হলো লোহা ও কয়লা। উপকরণের আকাশছোঁয়া দাম হওয়ায় কোরবানি ঈদের আগের এ ভরা মৌসুমেও তাঁদের তৈরি লোহার জিনিসপত্রের আশানুরূপ ক্রেতা মিলছে না। ফলে চরম হাতাশায় দিন কাটছে জয়পুরহাটের কামার শ্রমিকদের।
গত বছরও কোরবানি ঈদের আগে ব্যস্ত সময় পার করেছেন জেলার কামারপল্লী হিসেবে খ্যাত সদর উপজেলার দুর্গাদহ বাজার, খঞ্জনপুর বাজার, কুঠিবাড়ী ব্রিজ, পূর্ববাজার, মহিলা কলেজ, বিআরটিসি মোড়ে কামার শ্রমিকরা।
কিন্তু উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার সেই ব্যস্ততা কমে গেছে। লোহা-কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন অনেকটা অলস সময় পার করছেন তাঁরা। উপকরণের দাম অনুযায়ী তৈরি করা লোহার জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারছেন না তাঁরা। দাম শুনেই ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এদিকে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের এখন পুঁজিতে ঘাটতি পড়েছে। বেশি দামে লোহা আর কয়লা কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খাটাতে হচ্ছে ব্যবসায়। কিন্তু সেই টাকা সংগ্রহ করতে পারছেন না অনেকেই। ফলে বেসরকারি সংস্থা থেকে বেশি সুদে ঋণ নিতেও বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার দুর্গাদহ বাজার, গুলশানমোড়, বিআইডিসিমোড়, পৃর্ব বাজার,সরকারি মহিলা কলেজ গেট বসবাস করে প্রায় ২০০ কর্মকার পরিবার।
গুলশানমোড়ের কামার প্রদিব জানান ভাই আমাদের মাথায় হাত। লোহা ও কয়লা দাম বেশী হওয়ায় ক্রেতা কম। ঈদে মনে করে করেছিলাম ব্যবসা ভাল হবে।
জয়পুরহাট বিশ্বাপাড়া বাসিন্দা হাফিজুল, হাকিম জানান দা-ছুরি-বটিসহ আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র ক্রয় করার জন্য এসেছি, কিন্তু গত বছর যে দামে ক্রয় করেছি সে দামে আর পাচ্ছি না।
কামার পরিবারগুলো দা, কুড়াল, বঁটি, ছুরি, হাঁসুয়া, চাকু, কাঁচিসহ ঘর-গৃহস্থালির বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করে বিক্রি করে। এসব পণ্য বিক্রিতে বছরে দুই মৌসুমে রমরমা ব্যবসা হয় তাদের। একটা সময় হলো কোরবানি ঈদের আগে ও অন্যটি বোরো ধান কাটার মৌসুম। তখন জেলাজুড়ে ধান কাটার জন্য কাঁচির ব্যাপক চাহিদা থাকে। কিন্তু এ বছর ব্যবসা ভালো না হওয়ার অভিযোগ কামার শ্রমিকদের।
গত সোমবার দুপুরে দুর্গাদহ বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, কামারপল্লীর বেশির ভাগ ঘরে লোহার সামগ্রী তৈরির কাজ বন্ধ। কয়েকটি ঘরে খটখট শব্দে লোহার সামগ্রী তৈরির কাজ করছেন কারিগররা।
সেখানে কথা হয় কামার শ্রমিক উপেন কর্মকার, মৃদুল কর্মকার, হরেন কর্মকার, মদন কর্মকার, শ্রী বিষ্ণ চন্দ্র কর্মকারসহ অনেকের সঙ্গে। তাঁরা আক্ষেপের সুরে বলেন, সারা দেশের মানুষ সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের প্রণোদনা পেল। কিন্তু তাঁদের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি।
একসময় জয়পুরহাটসহ আশপাশের জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এক মাস আগে এসে লোহার তৈরি সামগ্রী কেনার জন্য আগাম বায়না দিয়ে যেতেন। এখন বায়না কমে গেছে। এ ছাড়া পাইকারি দরে লোহার সামগ্রী কেনার ব্যবসায়ীও খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে দুর্গাদহ বাজারের কামার শ্রমিক উপেন চন্দ্র কর্মকার বলেন, তাঁরা এখনো পূর্বপুরুষদের এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন।
কেউ পৈত্রিক পেশা ধরে রাখার লড়াই করছেন। কামার শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা চেয়েছেন কামার শিল্পের সাথে জড়িতরা।জয়পুরহাট জেলায় এই পেশার সঙ্গে জড়িত আছে অন্তত ২০০ পরিবার।