আলিগড়ের এক অন্ধকার গলির ভাঙাচোরা কোয়ার্টার থেকে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, আজ তার এক পাক্ষিক যবনিকাপাত ঘটল। দারিদ্র্যের সঙ্গে আজীবন লড়াই করা এবং ছেলে রিংকু সিংকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার নেপথ্য কারিগর খানচাঁদ সিং না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। লিভার ক্যানসারের চতুর্থ স্তরের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে গ্রেটার নয়ডার একটি হাসপাতালে আজ ভোরে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। জীবনের মায়া কাটিয়ে তার এই প্রস্থান সংবাদ যখন রিংকুর কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। পিতৃশোক আর দেশপ্রেমের দ্বন্দ্বে দীর্ণ রিংকু শেষ পর্যন্ত প্রিয় বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে আলিগড়ের পথে রওনা হয়েছেন।
রিংকু সিংয়ের আজকের এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে তার বাবার অবদান কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। এক সময় অভাবের সংসারে বাবা চাইতেন না ছেলে ক্রিকেট খেলে সময় নষ্ট করুক। এমনকি ক্রিকেটের কারণে রিংকু বাবার হাতের মারও খেয়েছেন অনেক। কিন্তু সেই শাসনই একদিন বদলে গিয়েছিল সীমাহীন ত্যাগে। ছেলের ব্যাটে রানের চাকা সচল রাখতে এই খানচাঁদ সিং বছরের পর বছর সাইকেলের পেছনে ভারী এলপিজি সিলিন্ডার বেঁধে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। রিংকুর সাফল্যের শুরুটা হয়েছিল এক স্কুল টুর্নামেন্টের ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়ে একটি মোটরবাইক জেতার মধ্য দিয়ে। সেদিন গ্যালারির আড়ালে দাঁড়িয়ে ছেলের ব্যাটিং দেখে খানচাঁদ বুঝেছিলেন, তার ছেলে শুধু খেলছে না, ইতিহাস গড়ছে। এরপর থেকে তিনি আর কোনোদিন রিংকুকে ক্রিকেটের জন্য বাধা দেননি।
ছেলের অঢেল প্রতিপত্তি আর গ্ল্যামারের মাঝেও খানচাঁদ ছিলেন মাটির মানুষ। রিংকু অনেকবার অনুরোধ করলেও তিনি তার সেই পুরনো দুই কক্ষের কোয়ার্টার কিংবা সিলিন্ডার টানার কাজ ছাড়েননি। নিজের শিকড় আঁকড়ে থাকার এক বিরল মানসিকতা ছিল তার মধ্যে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিজের অতীত ভুলে গেলে মানুষ তার অস্তিত্ব হারায়। গত বছর ছেলে একটি দামী স্পোর্টস বাইক উপহার দিলে তিনি সগর্বে জানিয়েছিলেন যে, আগে যারা তাকে গালি দিতেন এখন তারা তাকে ‘সাহেব’ বলে ডাকেন। মাঠের রিংকু সিং আজ হয়তো বড্ড একা হয়ে পড়লেন, কিন্তু তার প্রতিটি বাউন্ডারি আর প্রতিটি সাফল্যের মাঝে আজীবন মিশে থাকবেন সেই সংগ্রামী বাবা—যিনি নিজের কাঁধে কষ্টের বোঝা বয়ে ছেলের স্বপ্নের পথ মসৃণ করেছিলেন।