সম্পাদকীয়
শহরের ঘিঞ্জি গলি থেকে শুরু করে মফস্বলের প্রশস্ত পথ, আজকাল সবখানেই এক চেনা অথচ উদ্বেগজনক দৃশ্য চোখে পড়ে। একদল কিশোর দল বেঁধে ঘুরছে, কারো হাতে দামি স্মার্টফোন, কেউবা দ্রুতগতির মোটরবাইক নিয়ে মরণনেশায় মেতেছে। আপাতদৃষ্টিতে একে শৈশব-কৈশোরের সাধারণ চপলতা বা বন্ধুত্বের আড্ডা মনে হতে পারে, কিন্তু এই দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। এই সংকটের নাম ‘পথভ্রান্তি’, যা আমাদের আগামীর কারিগরদের কেবল বিপথগামীই করছে না, বরং পুরো সমাজকাঠামোকে এক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে কিশোর গ্যাং-এর উত্থান, যা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং এটি আমাদের সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোর ভেতর তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোর হলো এমন এক সন্ধিক্ষণ যখন একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয় এবং এই সময়ে তাদের মধ্যে প্রবল আত্মপরিচয়ের সংকট কাজ করে। তারা চায় অন্য সবার চেয়ে আলাদা হতে, সাহসিকতা প্রদর্শন করতে এবং কোনো একটি দলের অংশ হয়ে শক্তি অনুভব করতে। যখন পরিবার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা বিকল্প খোঁজে এবং এই বিকল্পই হলো আজকের ‘কিশোর গ্যাং’। এটি কেবল দুষ্টুমি নয়, বরং আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকরগুলোর এক জীবন্ত দলিল। যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই কিংবা খেলার মাঠের ধুলোবালি, সেই বয়সে কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে এক অন্ধকার চক্রে, যার শেষ পরিণতি প্রায়ই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান যুগের কিশোরদের প্রধান সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন। যোগাযোগ ও শিক্ষার অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে এটি ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকলেও, কিশোরদের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। খেলার মাঠ, লাইব্রেরির বইয়ের ঘ্রাণ কিংবা ভোরের নির্মল সূর্যের আলো তাদের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তারা ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টের মোহে নিজেদের সত্যিকারের জীবনকে বিসর্জন দিচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রূপালী পর্দার মোহ ও অনুকরণের সংস্কৃতি। সিনেমা ও ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্টগুলোতে অনেক সময় অপরাধ বা বেপরোয়া জীবনকে সাহসিকতার মোড়কে উপস্থাপন করা হয়।
কিশোর মন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অনুকরণপ্রিয়। তারা যখন দেখে সিনেমার নায়ক আইনি তোয়াক্কা না করে দ্রুতগতিতে বাইক চালাচ্ছে বা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে, তখন তারা অবচেতনভাবেই তাকে অনুকরণ করতে চায়। তাদের কাছে তখন ‘সাহসিকতা’ মানে হয়ে দাঁড়ায় নিয়ম ভাঙা। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে তারা রাস্তায় বিপজ্জনক বাইক রেসিংয়ে মেতে ওঠে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ নেয়। তারা বুঝতে পারে না যে, ক্যামেরার পেছনে যা ঘটছে তা নিছক চিত্রনাট্য, আর বাস্তব জীবনের প্রতিটি ভুলের মাশুল দিতে হয় রক্ত দিয়ে।
কিশোরদের হাতে অপরিণত বয়সে মোটরবাইক তুলে দেওয়া বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সামাজিক ব্যাধি। বিশেষজ্ঞরা জোরালোভাবে বলেন যে, ১৮ বছরের আগে কোনোভাবেই বাইক দেওয়া উচিত নয়। অভিভাবকরা অনেক সময় সন্তানের আবদার মেটাতে বা আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য বাইক কিনে দেন, কিন্তু তারা অনুধাবন করেন না যে, তারা আসলে সন্তানের হাতে একটি মরণাস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। কিশোরদের কাছে বাইক কেবল বাহন নয়, এটি তাদের দলগত আধিপত্যের প্রতীক। এই স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস যখন नियंत्रণের বাইরে চলে যায়, তখন তা কেবল ওই কিশোরের নয়, বরং পথচারীদের জীবনের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় সাইলেন্সার খুলে বিকট শব্দে বাইক চালানো কিংবা ‘হুইলি’ করার মতো কসরতগুলো আসলে এক ধরনের মানসিক অসুস্থতারই বহিঃপ্রকাশ, যা তারা বীরত্ব বলে ভুল করে।
এক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা হওয়া উচিত একজন প্রহরীর মতো, যে সচেতনভাবে আগলে রাখবে কিন্তু শ্বাসরুদ্ধ করবে না।
আধুনিকতার ইঁদুরদৌড়ে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না, যার ফলে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে কিশোররা মানসিকভাবে একা হয়ে পড়ছে। সন্তান যখন কোনো ভুল করে বা প্রতিবেশীরা যখন কোনো অভিযোগ নিয়ে আসে, অনেক অভিভাবকই তা ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে গ্রহণ করেন, যা মূলত কিশোরদের সংশোধনের পথ বন্ধ করে দেয়। সন্তানের ভুলকে আড়াল করা মানে তাকে ধ্বংসের পথে আরও একধাপ ঠেলে দেওয়া। অভিভাবকদের উচিত শাসনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া খোলামেলা আলোচনায়। সন্তানের বন্ধু কারা, সে মোবাইলে কী দেখছে, তার মনের ভেতর কী ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে তা বুঝতে হলে তার সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। মা-বাবার ভালোবাসা ও মনোযোগের অভাবই কিশোরদের ঘর থেকে বের করে রাস্তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
একইভাবে বিদ্যালয় কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার কারখানা হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত জীবন গঠনের পাঠশালা। একজন शिक्षक কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দান করবেন না, বরং তিনি হবেন শিক্ষার্থীর জীবনের দিশারী। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ কমে যাওয়ায় কিশোরদের উদ্যম বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। মেঘলা দিনে বাতাস যেমন নাবিককে দিকনির্দেশ করে, তেমনি বিভ্রান্ত কিশোরদের সঠিক পথ দেখাতে পারেন একজন শিক্ষক।
শ্রেণিকক্ষে নৈতিকতার শিক্ষা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। যদি কোনো শিক্ষার্থী বিপথে যাওয়ার লক্ষণ দেখায়, তবে তাকে তিরস্কার না করে সহানুভূতির সাথে কাউন্সিলিং করতে হবে। শিক্ষকের একটি মমতাময়ী দৃষ্টি বা একটি উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য একজন কিশোরের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম কিশোরদের মনে নিয়মানুবর্তিতার বীজ বপন করে, যা তাদের সামাজিকীকরণে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে কিশোর অপরাধ বা পথভ্রান্তি কেবল কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। এর সমাধানও করতে হবে সামাজিকভাবে। প্রতিটি পাড়া বা মহল্লায় যদি খেলার মাঠের সুব্যবস্থা থাকে, পাঠাগার থাকে এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, তবে কিশোরদের মনোযোগ অপরাধ থেকে সরে সৃজনশীলতায় নিবদ্ধ হবে। কমিউনিটি প্রজেক্টের মাধ্যমে কিশোরদের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত করা যেতে পারে, যেমন বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা দুস্থদের সাহায্য করা। যখন একজন কিশোর অনুভব করবে যে সমাজের জন্য তার কিছু অবদান রাখার সুযোগ আছে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক আত্মتৃপ্তি তৈরি হবে। সামাজিক এই সম্পৃক্ততা তাদের একা হওয়ার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয়।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তি সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। কিশোরদের শেখাতে হবে কীভাবে ইন্টারনেটে গঠনমূলক কাজ করা যায়। প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং বা অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে মোবাইল ফোনকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে রূপান্তর করা সম্ভব। সিনেমার গল্প এবং বাস্তব জীবনের পার্থক্যের সীমারেখা তাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলতে হবে। সাহসিকতা মানে যে পেশীশক্তি বা গতির লড়াই নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত রাখা ও সত্যের পথে থাকাই আসল বীরত্ব এই বোধ তাদের ভেতর জাগিয়ে তুলতে হবে। কিশোরদের মনে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, ইতিহাসের শিক্ষা এবং সাহিত্যের রসবোধ ছড়িয়ে দেওয়া গেলে তারা আর সস্তা বিনোদনের পেছনে ছুটবে না।
কল্পনা করুন এমন একটি সমাজ, যেখানে একটি ছোট শহরের সব কিশোর বিকেলে বাইক নিয়ে রাস্তায় মহড়া না দিয়ে স্থানীয় ফুটবল মাঠে ঘাম ঝরাচ্ছে। যেখানে মাগরিবের পর তারা গেমস-এ মগ্ন না থেকে পাড়ার লাইব্রেরিতে বসে বিতর্ক প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছে। এটি কোনো অলীক কল্পনা নয়; সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে আমাদের কিশোররা এটি করে দেখাতে সক্ষম। কোনো কোনো এলাকায় যখন কমিউনিটি সেন্টারের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, দেখা গেছে সেখানে কিশোর গ্যাং-এর উপদ্রব শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, তাদের অফুরಂತ শক্তিকে সঠিক চ্যানেলে প্রবাহিত করলে ধ্বংস নয়, বরং সৃষ্টিশীল কিছু বেরিয়ে আসে।
কিশোররা হলো একটি জাতির মেরুদণ্ড। তাদের এই অদম্য শক্তি, কৌতূহলী মন এবং অফুরন্ত সময় আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাদের পথভ্রান্তি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা, আর তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা। পরিবার যদি হয় ভিত্তি, তবে সমাজ হলো তার দেয়াল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো তার ছাদ। এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আজকের যে কিশোরটি বিপথে যাচ্ছে, সে আসলে কোনো না কোনো পরিবারের স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন কেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তার কারণ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
আমাদের বিচার করতে হবে আমাদের সামাজিক কাঠামোরও। আমরা কি তাদের উপযুক্ত বিনোদন দিতে পেরেছি? আমরা কি তাদের জন্য পর্যাপ্ত পার্ক বা খেলার জায়গা রাখতে পেরেছি? নাকি আমরা শুধু আকাশচুম্বী দালান গড়ে তুলেছি যেখানে শৈশবের কোনো স্থান নেই? আসুন, আমরা তাদের হাত ধরি, তাদের কথা শুনি এবং তাদের জন্য এমন এক পৃথিবী গড়ি যেখানে ভয় নেই, বিভ্রান্তি নেই, আছে কেবল স্বপ্নের হাতছানি। যদি আমরা আজ তাদের প্রতি সদয় হই এবং সঠিক পথ দেখাই, তবেই সেই হারানো উজ্জ্বল সকালগুলো আবার ফিরে আসবে। হাসি, স্বপ্ন আর সৃজনশীলতায় ভরে উঠবে আমাদের সমাজ। কিশোররা যখন তাদের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে রূপান্তর করবে, তখন কেবল তারাই নয়, পুরো দেশ একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
একটি উন্নত ও সুশীল সমাজের প্রধান লক্ষণ হলো তার তরুণ প্রজন্মের সঠিক পথে থাকা। কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা কমাতে কেবল জেল-জরিমানা বা কঠোর শাস্তিই সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করতে হবে। একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে কিশোরদের শক্তি, উদ্যম এবং সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার শিখতে হবে। বাইক, মোবাইল ফোন, বন্ধুত্ব, আনন্দ সবই যদি সঠিক দিকনির্দেশনায় মিশে যায়, তবে হারানো সকালগুলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আমরা দেখতে পাব একটি সমাজ যেখানে উদ্ভাবনী শক্তি, বন্ধুত্ব এবং স্বপ্ন একত্রে বিকশিত হচ্ছে, আর কিশোররা সেই বিকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ হয়ে উঠছে। তাদের ছোট ছোট অর্জনগুলোকে সাধুবাদ জানাতে হবে, তাদের ছোট ভুলগুলোকে ক্ষমার চোখে দেখে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে এক নতুন বাংলাদেশ, যেখানে কোনো কিশোর আর পথ হারাবে না, বরং প্রতিটি কিশোর হবে এক একটি সার্থকতার কারিগর।
নাহিদ হাসান রবিন
লেখক: কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট